জরায়ু নিচে নেমে যাওয়ার ৫টি লক্ষণ ও সতর্কতা

নারীদের তলপেটের পেশি এবং লিগামেন্টগুলো মূলত জরায়ু (Uterus) বা গর্ভাশয়কে তার নির্দিষ্ট স্থানে ধরে রাখে। কিন্তু বয়স বৃদ্ধি, স্বাভাবিক প্রসব (Normal Delivery) বা ভারী কাজ করার কারণে এই পেশিগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন জরায়ু তার স্বাভাবিক স্থান থেকে নিচে যোনিপথের (Vagina) দিকে ঝুলে পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ইউটেরাইন প্রোল্যাপস’ (Uterine Prolapse) বা জরায়ু নিচে নেমে যাওয়া বলা হয়।
অধিকাংশ নারীই লোকলজ্জা বা সংকোচের কারণে প্রথমদিকে এই সমস্যার কথা কাউকে বলতে চান না। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় এর লক্ষণগুলো শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করলে বড় ধরনের জটিলতা বা অপারেশন এড়ানো সম্ভব। চলুন, জরায়ু নিচে নেমে যাওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ বিস্তারিত জেনে নিই।


জরায়ু নিচে নেমে যাওয়ার ৫টি প্রধান লক্ষণ


প্রাথমিক অবস্থায় (First Degree Prolapse) জরায়ু সামান্য নিচে নামলে সাধারণত তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কিন্তু জরায়ু বেশি নিচে নেমে গেলে নিচের লক্ষণগুলো তীব্রভাবে প্রকাশ পায়:
১. তলপেটে বা যোনিপথে প্রচণ্ড ভারী অনুভূতি
জরায়ু নিচে নেমে যাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো তলপেটে এবং যোনিপথে সারাক্ষণ একটি অস্বাভাবিক ভারী বা টানটান অনুভূতি কাজ করা। রোগীর মনে হয় যেন যোনিপথ দিয়ে ভেতরের কোনো অঙ্গ বা বলের মতো কিছু একটা বাইরের দিকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা হাঁটাহাঁটি করলে এই ভারী অনুভূতি মারাত্মক আকার ধারণ করে।
২. যোনিপথ দিয়ে মাংসপিণ্ড বেরিয়ে আসা
সমস্যাটি যখন চরম আকার ধারণ করে (Third বা Fourth Degree Prolapse), তখন রোগী যোনিপথের বাইরে একটি গোলাকার মাংসপিণ্ড বা টিস্যু বেরিয়ে থাকতে দেখেন। হাঁচি-কাশি দিলে বা মলত্যাগের সময় চাপ দিলে এটি আরও বেশি বাইরের দিকে বেরিয়ে আসে, যা রোগীর জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর।
৩. প্রস্রাব আটকে থাকা বা ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
জরায়ু নিচে নেমে গেলে এটি সামনের দিকে থাকা মূত্রথলির (Bladder) ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে রোগীর বারবার প্রস্রাবের বেগ হয়, কিন্তু প্রস্রাব পুরোপুরি ক্লিয়ার হয় না বা আটকে থাকার অনুভূতি হয়। অনেক সময় হাঁচি বা কাশি দিলে অজান্তেই কয়েক ফোঁটা প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার (Urinary Incontinence) সমস্যা দেখা দেয়।
৪. মলত্যাগে তীব্র কষ্ট বা কোষ্ঠকাঠিন্য
জরায়ুর পেছনের দিকে থাকে মলাশয় বা রেক্টাম (Rectum)। জরায়ু নিচে ঝুলে পড়লে এটি মলাশয়ের ওপর চাপ দেয়, যার ফলে রোগীর মলত্যাগে মারাত্মক কষ্ট হয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয় এবং মলত্যাগের জন্য অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করতে হয়।
৫. কোমরের নিচের দিকে একটানা তীব্র ব্যথা
তলপেটের লিগামেন্টগুলোতে অতিরিক্ত টান পড়ার কারণে রোগীর পিঠের নিচের অংশে বা কোমরে একটানা তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি কাজ করে। বিশেষ করে সারাদিন কাজ করার পর বা ভারী কিছু তোলার পর এই ব্যথা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং শুয়ে বিশ্রাম নিলে ব্যথা কিছুটা কমে আসে।


জরায়ু নিচে নেমে যাওয়ার মাত্রা বা স্টেজ


জরায়ু কতটুকু নিচে নেমেছে, তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা একে কয়েকটি স্টেজে ভাগ করেন। সহজে বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি খেয়াল করুন:

প্রোলাপ্সের মাত্রা (Stage)জরায়ুর অবস্থান
প্রথম ডিগ্রি (1st Degree)জরায়ু তার স্বাভাবিক স্থান থেকে সামান্য নিচে যোনিপথের উপরিভাগে নেমে আসে।
দ্বিতীয় ডিগ্রি (2nd Degree)জরায়ু যোনিপথ বেয়ে নিচের দিকে নেমে একেবারে যোনিমুখ পর্যন্ত চলে আসে।
তৃতীয় ডিগ্রি (3rd Degree)জরায়ুর কিছু অংশ যোনিপথের বাইরে বেরিয়ে আসে, যা বাইরে থেকে দেখা যায়।
চতুর্থ ডিগ্রি (4th Degree)সম্পূর্ণ জরায়ু যোনিপথের বাইরে ঝুলে পড়ে (একে Procidentia বলা হয়)।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. ভারী কাজ করলে কি জরায়ু নিচে নেমে যেতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ। যারা নিয়মিত ভারী জিনিস তোলেন (যেমন- পানির বালতি, গ্যাসের সিলিন্ডার) বা অনেক ভারী কাজ করেন, তাদের তলপেটের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে জরায়ু নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
২. কেগেল ব্যায়াম (Kegel Exercise) কি জরায়ু নিচে নামা রোধ করতে পারে?
উত্তর: অবশ্যই। কেগেল ব্যায়াম বা পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ তলপেটের পেশিকে অত্যন্ত মজবুত করে। প্রাথমিক অবস্থায় জরায়ু নিচে নামা রোধ করতে এবং ডেলিভারির পর পেশি শক্ত করতে চিকিৎসকরা সবসময় এই ব্যায়াম করার পরামর্শ দেন।
৩. জরায়ু নিচে নেমে গেলে কি অপারেশন করা বাধ্যতামূলক?
উত্তর: না, প্রাথমিক অবস্থায় (১ম বা ২য় ডিগ্রি) অপারেশন লাগে না। চিকিৎসক ‘পেসারি’ (Pessary) নামক একটি ছোট্ট রিং যোনিপথে পরিয়ে দেন, যা জরায়ুকে সাপোর্ট দেয়। তবে জরায়ু পুরোপুরি বাইরে বেরিয়ে এলে (৩য় বা ৪র্থ ডিগ্রি) সার্জারির প্রয়োজন হয়।


বিশেষ সংবেদনশীল সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যোনিপথে কোনো মাংসপিণ্ড অনুভব করলে বা তীব্র ভারী অনুভূতি হলে লোকলজ্জার ভয়ে চেপে না রেখে, দ্রুত একজন অভিজ্ঞ গাইনি বিশেষজ্ঞের (Gynecologist) পরামর্শ নিন। অবহেলা করলে এটি পরবর্তীতে মারাত্মক ইনফেকশন বা ঘায়ের সৃষ্টি করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *