ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো এক ধরনের নীরবতা বা জড়তা কাজ করে। লজ্জায়, ভয়ে বা নিছক অবহেলায় অনেকেই এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো লুকিয়ে রাখেন বা গুরুত্ব দেন না, যার পরিণতি পরবর্তীতে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, একদম প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ ১ বা ২) ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা নিলে এই রোগ থেকে শতভাগ সুস্থ হওয়া সম্ভব।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্রেস্ট ক্যান্সারের শুরুতে কোনো ব্যথা থাকে না, তাই রোগীরা বুঝতে পারেন না যে শরীরে বড় কোনো রোগ বাসা বাঁধছে। সঠিক সময়ে ব্রেস্ট ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ গুলো নিজে নিজে শনাক্ত করতে পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো যায়। চলুন জেনে নিই, স্তনের কোন পরিবর্তনগুলো দেখলে আপনার দ্রুত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
ব্রেস্ট ক্যান্সারের প্রধান ৫টি প্রাথমিক লক্ষণ
ব্রেস্ট ক্যান্সার সাধারণত খুব ধীরগতিতে ছড়ায়। শুরুতে এটি স্তনের ভেতরে একটি ছোট কোষ হিসেবে জন্ম নেয়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি শরীরে যে সংকেতগুলো দেয়:
স্তনে বা বগলে চাকা (Lump): এটি ব্রেস্ট ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রধান লক্ষণ। স্তনের ভেতরে বা বগলের নিচে মার্বেল বা মটরশুঁটির মতো শক্ত কোনো চাকা বা পিণ্ড অনুভব করা। এই চাকাগুলো সাধারণত ব্যথাহীন হয় এবং হাত দিলে সহজে নড়ে না (ত্বকের সাথে আটকে থাকে)।
স্তনের আকার বা আকৃতিতে পরিবর্তন: কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে যদি একটি স্তন অন্যটির চেয়ে অস্বাভাবিক বড় বা ছোট হয়ে যায়, অথবা স্তনের শেপ বা আকৃতি পাল্টে যায়।
ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন: স্তনের ত্বক যদি কমলার খোসার মতো ছোট ছোট গর্ত বা কুঁচকে যায় (Peau d’orange), ত্বকে লালচে ভাব বা র্যাশ দেখা দেয়, অথবা চামড়া অস্বাভাবিক মোটা বা শক্ত হয়ে যায়।
নিপল বা স্তনবৃন্তের পরিবর্তন: নিপল বা স্তনের বোঁটা হঠাৎ করে ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া (Inverted nipple) ক্যান্সারের একটি বড় সংকেত। এছাড়া নিপলের চারপাশে দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি বা ঘা হওয়া।
অস্বাভাবিক তরল বা রক্ত বের হওয়া: গর্ভাবস্থা বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় ছাড়া, এমনিতে যদি নিপল থেকে কোনো ধরনের কষ, পুঁজ বা রক্ত মিশ্রিত তরল (Discharge) বের হয়।
স্বাভাবিক পরিবর্তন নাকি ক্যান্সারের লক্ষণ? (পার্থক্য বুঝুন)
অনেক সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে স্তনে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন আসে, যা নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিচের টেবিলটি থেকে পার্থক্যটি সহজে বুঝে নিন:
| লক্ষণের ধরন | স্বাভাবিক বা হরমোনজনিত পরিবর্তন | ব্রেস্ট ক্যান্সারের সংকেত |
| চাকা বা ফোলাভাব | মাসিক বা পিরিয়ডের আগে স্তন ভারী হওয়া বা চাকা লাগা, যা পিরিয়ড শেষে ঠিক হয়ে যায়। | পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরও চাকা বা পিণ্ডটি থেকে যাওয়া এবং ক্রমশ বড় হওয়া। |
| ব্যথা বা অস্বস্তি | পিরিয়ডের আগে স্তনে হালকা ব্যথা বা শিরশির অনুভূতি হওয়া স্বাভাবিক। | সাধারণত কোনো ব্যথা থাকে না, তবে চাকাটি শক্ত এবং অস্বাভাবিক মনে হয়। |
| নিপল থেকে তরল | শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় বা স্তন চেপে ধরলে সামান্য সাদা তরল আসা। | কোনো চাপ ছাড়াই আপনা-আপনি নিপল দিয়ে রক্ত বা কষ বের হওয়া। |
| বগলের নিচে ফোলা | শেভিং বা অ্যালার্জির কারণে বগলে সাধারণ গোটা ওঠা। | বগলের নিচে শক্ত চাকা হওয়া, যা কমে না বা ব্যথা করে না। |
ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন (BSE) বা নিজে পরীক্ষা করার নিয়ম
ব্রেস্ট ক্যান্সার থেকে রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সচেতনতা এবং ‘ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন’। ২০ বছর বয়স পার হওয়ার পর থেকে প্রত্যেক নারীর উচিত মাসে অন্তত একবার (মাসিক শেষ হওয়ার ৩-৫ দিন পর) আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্তন পরীক্ষা করা।
হাত ও আঙুলের সাহায্যে স্তনের সব অংশে এবং বগলের নিচে চেপে চেপে দেখতে হবে কোনো অস্বাভাবিক চাকা, শক্ত ভাব বা তরল আছে কি না। কোনো সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. স্তনে চাকা বা টিউমার মানেই কি ক্যান্সার?
উত্তর: একদমই না। স্তনে হওয়া চাকাগুলোর মধ্যে ৮০ শতাংশই হলো ‘বিনাইন টিউমার’ বা সাধারণ চাকা (যেমন: ফাইব্রোঅ্যাডিনোমা বা সিস্ট), যা ক্যান্সার নয়। তবে যেকোনো চাকা দেখা দিলেই তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
২. ব্রেস্ট ক্যান্সার কি শুধু মহিলাদেরই হয়?
উত্তর: না, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। পুরুষদের স্তনেও কোষ থাকে, তাই পুরুষদেরও ব্রেস্ট ক্যান্সার হতে পারে। তবে মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক কম (১% এরও কম)।
৩. পরিবারে কারও ব্রেস্ট ক্যান্সার না থাকলে কি আমার হওয়ার ঝুঁকি আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, ঝুঁকি আছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া প্রায় ৭০-৮০% রোগীরই পরিবারে আগে কারও এই রোগ ছিল না। তাই বংশগত কারণ ছাড়াও বয়স, ওজন বা জীবনযাপনের কারণে এটি হতে পারে।
৪. ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসায় কি সবসময় স্তন কেটে ফেলতে হয়?
উত্তর: না। একদম প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ ১) ক্যান্সার ধরা পড়লে পুরো স্তন না কেটে, শুধুমাত্র টিউমারটি (লুম্পেক্টমি) অপারেশন করে ফেলে দিলে এবং রেডিওথেরাপি দিলে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। স্তনে সামান্যতম অস্বাভাবিক কোনো চাকা, ঘা বা পরিবর্তন লক্ষ্য করলে লজ্জা না পেয়ে দ্রুত একজন গাইনোকোলজিস্ট বা ব্রেস্ট সার্জনের পরামর্শ নিন।