ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে কোন রোগ হয় ও এর প্রতিকার

আমাদের শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার জন্য যে কয়েকটি অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন প্রয়োজন, তার মধ্যে ‘ভিটামিন বি১২’ (Vitamin B12) বা কোবালামিন অন্যতম। এটি আমাদের ব্রেন বা স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখে এবং শরীরে লাল রক্তকণিকা (RBC) ও ডিএনএ তৈরিতে সরাসরি কাজ করে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, আমাদের শরীর নিজে থেকে এই ভিটামিনটি তৈরি করতে পারে না; খাবারের মাধ্যমেই এর চাহিদা মেটাতে হয়।
দীর্ঘদিন শরীরে এই গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে তা স্থায়ীভাবে ব্রেন এবং স্নায়ুর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। সাধারণ ক্লান্তি থেকে শুরু করে এটি বড় ধরনের রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সঠিক সময়ে ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে কোন রোগ হয় তা শনাক্ত করতে পারলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়ানো সম্ভব। চলুন জেনে নিই, এই ভিটামিনের অভাবে শরীরে প্রধানত কোন রোগগুলো বাসা বাঁধে এবং শরীর কী কী সংকেত দেয়।


ভিটামিন বি১২ এর অভাবে হওয়া প্রধান ৫টি রোগ ও লক্ষণ


শরীরে ভিটামিন বি১২ মারাত্মকভাবে কমে গেলে মূলত স্নায়ুতন্ত্র এবং রক্ত কোষের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসে। এর ফলে নিচের রোগ ও লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া (মারাত্মক রক্তশূন্যতা): ভিটামিন বি১২ এর অভাবে শরীর পর্যাপ্ত সুস্থ লাল রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। এর ফলে ‘মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া’ নামক রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। রোগী সারাক্ষণ চরম ক্লান্তি, দুর্বলতা এবং মাথা ঘোরানো অনুভব করেন। ত্বক ফ্যাকাশে বা হালকা হলদেটে (জন্ডিসের মতো) হয়ে যায়। (টিপস: রক্তশূন্যতার কারণে হওয়া পেশির চরম ক্লান্তি ও আড়ষ্টতা সাময়িকভাবে কাটাতে পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি একটি ভালো মানের বডি ম্যাসাজার (Body Massager) ব্যবহার করলে মাংসপেশি চমৎকার আরাম পায়)।
পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি (স্নায়ুর ক্ষতি ও অবশ ভাব): বি১২ এর অভাবে স্নায়ুর বাইরের আবরণ বা ‘মায়োলিন শিথ’ নষ্ট হতে শুরু করে। এর ফলে হাত ও পায়ের তালুতে সুঁই ফোটার মতো তীব্র অনুভূতি হয়, জ্বালাপোড়া করে এবং অনেক সময় হাত-পা অবশ বা অসাড় হয়ে যায়। (পায়ের স্নায়ুর এই দুর্বলতা ও অবশ ভাব কাটাতে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে একটি ফুট ম্যাসাজার (Foot Massager) ব্যবহার করা অত্যন্ত আরামদায়ক ও কার্যকরী)।
স্মৃতিভ্রম, বিষণ্ণতা ও ডিমেনশিয়া: স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ব্রেনের স্বাভাবিক কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। রোগী খুব সাধারণ জিনিস ভুলে যেতে শুরু করেন, মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন এবং অকারণে তীব্র বিষণ্ণতা বা স্ট্রেসে ভোগেন। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি স্থায়ী ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের রূপ নিতে পারে। (অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস থেকে দ্রুত রিল্যাক্স হতে রাতে ঘুমানোর আগে একটি হেড ম্যাসাজার (Head Massager) ব্যবহার করলে স্নায়ুগুলো শান্ত হয় এবং ভালো ঘুম হয়)।
গ্লসাইটিস (মুখে ঘা ও জিহ্বা ফুলে যাওয়া): ভিটামিন বি১২ এর অভাবের একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ হলো ‘গ্লসাইটিস’। এতে জিহ্বা লাল হয়ে ফুলে যায়, জিহ্বার স্বাদগ্রন্থিগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং মুখে বা মাড়িতে বারবার যন্ত্রণাদায়ক ঘা (Mouth Ulcers) হয়।
ভারসাম্য হারানো ও পেশির দুর্বলতা: দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতির কারণে স্নায়ুতন্ত্রের এতটাই অবনতি হয় যে, রোগীর হাঁটাহাঁটি করতে সমস্যা হয়। পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হাঁটার সময় শরীরের ভারসাম্য বা ব্যালেন্স রাখতে কষ্ট হয়। (পেশির এই দুর্বলতায় চলাফেরার সময় জয়েন্টে সাপোর্ট দিতে চিকিৎসকের পরামর্শে একটি ভালো মানের নি সাপোর্ট (Knee Support) ব্যবহার করলে দারুণ স্বস্তি পাওয়া যায়)।


ভিটামিন বি১২ এর সেরা ৫টি প্রাকৃতিক উৎস


যেহেতু শরীর নিজে এই ভিটামিন বানাতে পারে না, তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় নিচের খাবারগুলো রাখা অত্যন্ত জরুরি:

খাবারের নামভিটামিন বি১২ এর অবস্থাকাদের জন্য বেশি জরুরি?
গরু ও খাসির কলিজাএটি ভিটামিন বি১২ এর সবচেয়ে বড় খনি।যাদের মারাত্মক রক্তশূন্যতা ও দুর্বলতা আছে।
সামুদ্রিক মাছ (স্যালমন, টুনা)প্রচুর বি১২ এবং ওমেগা-৩ থাকে।হার্ট ও স্নায়ু সুস্থ রাখার জন্য।
ডিম ও মুরগির মাংসপ্রতিদিনের চাহিদার একটি বড় অংশ মেটায়।সব বয়সী সুস্থ মানুষের জন্য।
দুধ, পনির ও টক দইবি১২ এর পাশাপাশি ক্যালসিয়াম জোগায়।হাড় মজবুত করতে এবং গ্যাস্ট্রিক দূরে রাখতে।
ফর্টিফাইড সিরিয়াল বা ইস্টকৃত্রিমভাবে ভিটামিন যুক্ত করা থাকে।যারা সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী (Vegan) তাদের জন্য।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. নিরামিষভোজীদের কি ভিটামিন বি১২ এর অভাব বেশি হয়?
উত্তর: হ্যাঁ। ভিটামিন বি১২ প্রাকৃতিকভাবে শুধুমাত্র প্রাণিজ খাবারে (মাছ, মাংস, ডিম, দুধ) পাওয়া যায়। তাই যারা সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী (Vegan), তাদের শরীরে এই ভিটামিনের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয়। তাদের চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত।
২. ভিটামিন বি১২ এর ঘাটতি কি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব?
উত্তর: অবশ্যই। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ঘাটতির মাত্রা নির্ণয় করে চিকিৎসকরা ভিটামিন বি১২ এর ইনজেকশন বা ট্যাবলেট দিয়ে থাকেন, যা কোর্স পূর্ণ করলে ঘাটতি পুরোপুরি দূর হয়ে যায়।
৩. গ্যাসের ওষুধ বেশি খেলে কি বি১২ এর ঘাটতি হয়?
উত্তর: হ্যাঁ। দীর্ঘদিন একটানা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ (যেমন: ওমিপ্রাজল) খেলে পাকস্থলীর এসিড কমে যায়। আর খাবার থেকে ভিটামিন বি১২ শোষণ করার জন্য পাকস্থলীর এসিড অত্যন্ত জরুরি। তাই অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়া ক্ষতিকর।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। হাত-পা অবশ হওয়া বা চরম ক্লান্তি দেখা দিলে ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ভিটামিন ট্যাবলেট কিনে খাবেন না। সঠিক মাত্রায় চিকিৎসা না হলে স্নায়ুর ক্ষতি স্থায়ী হতে পারে। তাই সিবিসি (CBC) এবং বি১২ লেভেল পরীক্ষার জন্য অবশ্যই একজন মেডিসিন বা নিউরোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *