শুকনো বা শুকিয়ে যাওয়া থাইরয়েডের ৫টি প্রধান লক্ষণ

আমাদের গলায় প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি থাকে, যাকে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড বলা হয়। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন আমাদের শরীরের ওজন, হজম প্রক্রিয়া এবং হার্টবিট নিয়ন্ত্রণ করে।
সাধারণ ভাষায় যে থাইরয়েডের কারণে মানুষের শরীরের ওজন দ্রুত কমে যায় বা শরীর শুকিয়ে যায়, তাকে ‘শুকনো থাইরয়েড’ বা ‘চিকন হওয়ার থাইরয়েড’ বলা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর আসল নাম হলো ‘হাইপারথাইরয়েডিজম’ (Hyperthyroidism)। থাইরয়েড গ্ল্যান্ড যখন প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করতে শুরু করে, তখনই এই রোগটি দেখা দেয়। চলুন, শুকিয়ে যাওয়া থাইরয়েডের প্রধান লক্ষণগুলো বিস্তারিত জেনে নিই।


শুকনো বা হাইপারথাইরয়েডিজমের প্রধান ৫টি লক্ষণ


রক্তে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে শরীরের ভেতরের ইঞ্জিন বা মেটাবলিজম অতিরিক্ত দ্রুত কাজ করতে শুরু করে। এর ফলে শরীর নিচের লক্ষণগুলোর মাধ্যমে সংকেত দেয়:
১. কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
শুকনো থাইরয়েডের সবচেয়ে প্রধান এবং প্রথম লক্ষণ হলো অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস। রোগীর খাদ্যাভ্যাস একেবারে স্বাভাবিক থাকে, এমনকি অনেকের আগের চেয়ে খাবারে রুচি বা ক্ষুধাও বেড়ে যায়। কিন্তু প্রচুর খাওয়ার পরও রোগীর শরীরের ওজন জাদুকরীভাবে কমতে থাকে এবং শরীর শুকিয়ে দুর্বল হয়ে যায়।
২. বুক ধড়ফড় করা ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
রক্তে থাইরয়েড হরমোন বেড়ে গেলে হার্টের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায়। রোগী বিশ্রামরত অবস্থায় বসে থাকলেও মনে হয় বুক প্রচণ্ড ধড়ফড় করছে (Palpitations) বা হার্টবিট অনেক দ্রুত চলছে। অনেক সময় নাড়ির স্পন্দন (Pulse rate) মিনিটে ১০০-এর ওপরে চলে যায়।
৩. অতিরিক্ত গরম লাগা ও প্রচুর ঘাম হওয়া
হাইপারথাইরয়েডিজমের রোগীদের শরীর সবসময় ভেতর থেকে গরম থাকে। আবহাওয়া স্বাভাবিক বা ঠান্ডা থাকলেও তারা প্রচণ্ড গরম অনুভব করেন এবং সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের শরীর অনেক বেশি ঘামতে থাকে।
৪. হাত কাঁপা ও মানসিক অস্থিরতা কাজ করা
এই হরমোনের প্রভাবে রোগীর স্নায়ুতন্ত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। ফলে কোনো কাজ করার সময় বা হাত সোজা করে রাখলে হাতের আঙুল হালকা কাঁপতে থাকে (Tremor)। এর পাশাপাশি রোগীর মধ্যে সারাক্ষণ একধরনের মানসিক অস্থিরতা, অকারণে ভয় পাওয়া এবং মেজাজ চরম খিটখিটে হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।
৫. বারবার মলত্যাগ ও মাসিকে অনিয়ম
হজম প্রক্রিয়া অতিরিক্ত দ্রুত হয়ে যাওয়ার কারণে রোগীর বারবার মলত্যাগের প্রয়োজন হয় বা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিক বা পিরিয়ড অত্যন্ত অনিয়মিত হয়ে যায় এবং মাসিকের রক্তপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে চোখ বড় বড় হয়ে যাওয়ার (Bulging eyes) সমস্যাও দেখা যায়।


মোটা হওয়ার থাইরয়েড বনাম শুকিয়ে যাওয়ার থাইরয়েড


থাইরয়েডের দুটি প্রধান ধরন নিয়ে মানুষের মনে প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সহজে বোঝার জন্য নিচে এদের পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

লক্ষণের ধরনহাইপোথাইরয়েডিজম (মোটা হওয়ার থাইরয়েড)হাইপারথাইরয়েডিজম (শুকনো থাইরয়েড)
ওজনের পরিবর্তননা খেয়ে থাকলেও ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে।প্রচুর খাওয়ার পরও শরীর শুকিয়ে যায় বা ওজন কমে।
তাপমাত্রার অনুভূতিসারাক্ষণ শীত শীত লাগে বা অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভব হয়।সারাক্ষণ প্রচুর গরম লাগে এবং অতিরিক্ত ঘাম হয়।
হৃদস্পন্দন ও নাড়িহার্টবিট স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ধীর গতির হয়।বুক ধড়ফড় করে এবং হার্টবিট অনেক দ্রুত হয়।
হজম প্রক্রিয়াকোষ্ঠকাঠিন্য বা পেট কষা হওয়ার সমস্যা থাকে।বারবার মলত্যাগ বা পাতলা পায়খানার সমস্যা হয়।


শুকিয়ে যাওয়া থাইরয়েডের চিকিৎসা কী?


হাইপারথাইরয়েডিজম অত্যন্ত গুরুতর একটি সমস্যা, যা হার্ট ও হাড়ের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তবে সঠিক চিকিৎসায় এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব:
অ্যান্টি-থাইরয়েড ওষুধ: হরমোনের অতিরিক্ত উৎপাদন কমানোর জন্য চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট মাত্রার ওষুধ দিয়ে থাকেন।
তেজস্ক্রিয় আয়োডিন (Radioactive Iodine): এটি থাইরয়েড গ্রন্থির অতিরিক্ত সক্রিয় কোষগুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক করে।
সার্জারি: কিছু ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থির একাংশ বা সম্পূর্ণ অংশ কেটে ফেলার (Thyroidectomy) প্রয়োজন হতে পারে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. শুকনো থাইরয়েড কি পুরোপুরি ভালো হয়?
উত্তর: এটি পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হলেও, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে হরমোনের মাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখা যায় এবং রোগী সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।
২. হাইপারথাইরয়েডিজম হলে কী ধরনের খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
উত্তর: সামুদ্রিক মাছ, সামুদ্রিক শৈবাল, এবং আয়োডিন যুক্ত লবণ অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ আয়োডিন থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন আরও বাড়িয়ে দেয়।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। ওপরের লক্ষণগুলো একটানা দেখা দিলে নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (Endocrinologist) বা হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। রক্তে TSH, T3 এবং T4 হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করলেই এই রোগ খুব সহজে শনাক্ত করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *