ডেঙ্গু এখন আমাদের দেশে, বিশেষ করে বর্ষা ও শরৎকালে একটি পরিচিত এবং আতঙ্কের নাম। এডিস মশার কামড়ে ছড়ানো এই ভাইরাসজনিত রোগটি সঠিক সময়ে শনাক্ত করতে না পারলে মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। ডেঙ্গু জ্বর হলে আতঙ্কিত না হয়ে, এর লক্ষণগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ যদি হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন, তবে সেটি সাধারণ জ্বর নাকি ডেঙ্গু, তা বোঝার জন্য ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ গুলো জানা থাকা প্রয়োজন। আসুন, ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক ও বিপজ্জনক লক্ষণগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক বা সাধারণ লক্ষণসমূহ
ডেঙ্গু ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার সাধারণত ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। ডেঙ্গুর প্রথম ধাপে যে সাধারণ লক্ষণগুলো দেখা যায়, সেগুলো হলো:
হঠাৎ তীব্র জ্বর: ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ করে অনেক বেশি জ্বর আসা। শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (104°F) পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
প্রচণ্ড মাথাব্যথা: জ্বরের পাশাপাশি মাথার সামনের দিকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়।
চোখের পেছনে ব্যথা: এটি ডেঙ্গুর একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ। চোখ নাড়াচাড়া করলে এই ব্যথা আরও বেড়ে যায়।
পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা: শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে বা গিঁটে এবং পেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এই ব্যথার তীব্রতার কারণে ডেঙ্গুকে অনেক সময় ‘ব্রেকবোন ফিভার’ বা হাড়ভাঙা জ্বরও বলা হয়।
বমি বমি ভাব ও বমি: রোগীর খাবারে অরুচি দেখা দেয় এবং বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
ত্বকে র্যাশ বা ফুসকুড়ি: জ্বর শুরুর ২ থেকে ৫ দিন পর শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে বুকে, পিঠে বা হাতে লালচে র্যাশ বা অ্যালার্জির মতো দাগ দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গুর বিপজ্জনক বা অ্যালার্মিং লক্ষণ (Warning Signs)
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু সাধারণ জ্বরের মতোই কয়েকদিন পর সেরে যায়। কিন্তু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর কমার পর বা জ্বরের মধ্যেই কিছু বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দেয়, যাকে ‘সিভিয়ার ডেঙ্গু’ বা ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’ বলা হয়। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়:
তীব্র পেট ব্যথা: পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া এবং পেট ফুলে যাওয়া।
ক্রমাগত বমি: দিনে অন্তত তিনবার বা তার বেশি বমি হওয়া।
রক্তপাত: নাক, দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়া কিংবা বমি ও পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া।
অত্যধিক ক্লান্তি ও অস্থিরতা: রোগী খুব দুর্বল হয়ে পড়ে, সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব থাকে অথবা খুব বেশি অস্থির আচরণ করে।
শ্বাসকষ্ট: বুকে পানি জমার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়া: জ্বর হঠাৎ করে একদম কমে গিয়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এবং ঘাম দেওয়া।
সাধারণ জ্বর নাকি ডেঙ্গু? (পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে?)
অনেকেই সাধারণ ভাইরাল ফিভার এবং ডেঙ্গুর মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। নিচের টেবিলটি আপনাকে পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করবে:
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ জ্বর (Viral Fever) | ডেঙ্গু জ্বর (Dengue Fever) |
| জ্বরের তীব্রতা | মাঝারি থেকে বেশি হতে পারে। | হঠাৎ করে খুব তীব্র জ্বর (১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত) হয়। |
| চোখে ব্যথা | সাধারণত চোখে ব্যথা থাকে না। | চোখের ঠিক পেছনের দিকে তীব্র ব্যথা হয়। |
| শরীরে ব্যথা | হালকা গা ম্যাজম্যাজ করা বা ব্যথা। | পেশি ও জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা (হাড়ভাঙা ব্যথা) থাকে। |
| র্যাশ বা দাগ | ত্বকে কোনো র্যাশ বের হয় না। | ২-৫ দিনের মাথায় শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেয়। |
| রক্তপাত | রক্তপাতের কোনো ঝুঁকি থাকে না। | বিপজ্জনক পর্যায়ে নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। |
ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে প্রাথমিক করণীয়
আপনার বা আপনার পরিচিত কারও মধ্যে যদি ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা জরুরি:
১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন: ডেঙ্গু রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। কোনো ধরনের ভারী কাজ করা যাবে না।
২. প্রচুর তরল খাবার খান: ডেঙ্গুতে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। তাই স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, স্যুপ এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।
৩. তাপমাত্রা মনিটর করুন: একটি ভালো মানের ডিজিটাল থার্মোমিটার দিয়ে নিয়মিত জ্বর মাপুন এবং লিখে রাখুন। এতে ডাক্তারকে রিপোর্ট দিতে সুবিধা হবে।
৪. ব্যথানাশক ওষুধ থেকে বিরত থাকুন: জ্বর বা ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন: আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন, ডাইক্লোফেনাক) খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এগুলো খেলে রক্তপাতের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
কখন ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে যাবেন?
প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই ডেঙ্গু টেস্ট (যেমন: NS1 Antigen বা CBC) করানোর জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে যদি রোগীর শরীরে উপরে উল্লিখিত বিপজ্জনক লক্ষণগুলোর (Warning Signs) যেকোনো একটিও দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি সাধারণ তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের বিকল্প নয়। যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় দ্রুত একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।