হাই প্রেসার ও লো প্রেসার এর লক্ষণ: ৫টি বিপদের সংকেত ও উপায়

আমাদের শরীর সুস্থভাবে কাজ করার জন্য রক্তনালীর ভেতর দিয়ে রক্তের একটি নির্দিষ্ট গতি বা চাপে প্রবাহিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একেই রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেশার বলা হয়। একজন সুস্থ মানুষের স্বাভাবিক রক্তচাপ হলো ১২০/৮০ (120/80 mmHg)। এই চাপ যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়, তখন তাকে ‘হাই প্রেসার’ (উচ্চ রক্তচাপ) এবং যখন কমে যায়, তখন তাকে ‘লো প্রেসার’ (নিম্ন রক্তচাপ) বলে।
প্রেসার হাই হোক বা লো—দুটিই শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। হাই প্রেসারকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’, যা ব্রেন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে, লো প্রেসারের কারণে ব্রেনে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে বাধা পায়, ফলে রোগী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। তাই সঠিক সময়ে হাই প্রেসার ও লো প্রেসার এর লক্ষণ শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। চলুন জেনে নিই, এই দুই অবস্থায় শরীর কী কী নীরব সংকেত দেয়।


হাই প্রেসার (উচ্চ রক্তচাপ) এর প্রধান লক্ষণ


বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাই প্রেসারের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পায় না, তবে প্রেসার মারাত্মকভাবে বেড়ে গেলে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দেয়:
তীব্র মাথা ব্যথা ও ঘাড়ের পেছনে অস্বস্তি: সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথার পেছনের অংশে বা ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা ও ভারি অনুভূতি হওয়া হাই প্রেসারের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। (টিপস: অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা হাই প্রেসারের কারণে হওয়া এই মাথাব্যথা ও স্নায়বিক অস্বস্তি সাময়িকভাবে কমাতে রাতে ঘুমানোর আগে একটি ভালো মানের হেড ম্যাসাজার (Head Massager) ব্যবহার করলে স্নায়ুগুলো শান্ত হয়)।
বুক ধড়ফড় করা ও শ্বাসকষ্ট: সামান্য পরিশ্রমে বা সিঁড়ি ভাঙতে গেলে বুকে প্রচণ্ড চাপ অনুভব হওয়া, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া এবং বুক ধড়ফড় করা উচ্চ রক্তচাপের মারাত্মক সংকেত।
চোখে ঝাপসা দেখা ও নাক দিয়ে রক্ত পড়া: প্রেসার হঠাৎ খুব বেশি বেড়ে গেলে চোখের রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায় এবং অনেকের অকারণে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। (উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপের সামান্যতম লক্ষণ দেখা দিলে ঘরে বসেই নিখুঁতভাবে প্রেশার মনিটর করার জন্য হাতের কাছে একটি নির্ভুল ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন রাখা অত্যন্ত জরুরি)।


লো প্রেসার (নিম্ন রক্তচাপ) এর প্রধান লক্ষণ


রক্তচাপ ৯০/৬০ (90/60 mmHg)-এর নিচে নেমে গেলে ব্রেন এবং অন্যান্য অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে না। এর প্রধান সংকেতগুলো হলো:
মাথা ঘোরা ও হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ালে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠা এবং চোখে অন্ধকার দেখা লো প্রেসারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। অনেক সময় রোগী ভারসাম্য হারিয়ে অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন।
চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা: সারাক্ষণ শরীর ম্যাজম্যাজ করা, কোনো কাজে এনার্জি না পাওয়া এবং সামান্য পরিশ্রমেই চরম দুর্বল অনুভব করা। (প্রেশার ওঠানামা করার কারণে শরীরে এই চরম দুর্বলতা ও পেশির আড়ষ্টতা দেখা দিলে একটি বডি ম্যাসাজার (Body Massager) সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে)।
বমি বমি ভাব ও ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া: লো প্রেসারে অকারণে গা গোলায় বা বমি বমি ভাব হয়। শরীরের রক্ত চলাচল কমে যাওয়ায় ত্বক ফ্যাকাশে ও অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে যায়। (লো প্রেসারের কারণে শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে গেলে বা ঘাম দিলে, শরীরের সঠিক তাপমাত্রা বুঝতে একটি নির্ভুল ডিজিটাল থার্মোমিটার (Digital Thermometer) ব্যবহার করা উচিত)।


হাই প্রেসার নাকি লো প্রেসার? (পার্থক্য বুঝুন)


আপনার সমস্যাটি ঠিক কোন প্রেসারের কারণে হচ্ছে, তা নিচের ছকটি থেকে সহজেই বুঝতে পারবেন:

লক্ষণের ধরনহাই প্রেসার (Hypertension)লো প্রেসার (Hypotension)
মাথা ও ঘাড়মাথার পেছনে ও ঘাড়ে তীব্র ব্যথা এবং ভারি অনুভূতি থাকে।বসা থেকে উঠলে মাথা ঘোরে এবং চোখে অন্ধকার বা সর্ষে ফুল দেখে।
বুক ও শ্বাসসামান্য কাজে বুক ধড়ফড় করে এবং শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়।সাধারণত বুকে ব্যথা থাকে না, তবে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ও অগভীর হয়ে যায়।
শরীর ও ত্বককান বা মুখ লাল হয়ে যেতে পারে এবং প্রচুর ঘাম হয়।শরীর চরম দুর্বল লাগে, ত্বক ফ্যাকাশে এবং হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
প্রধান ঝুঁকিঅতিরিক্ত লবণ, ফাস্টফুড, মেদ এবং মানসিক স্ট্রেসের কারণে হয়।শরীরে পানিশূন্যতা (ডায়রিয়া/বমি), রক্তশূন্যতা বা অতিরিক্ত উপবাসের কারণে হয়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. প্রেসার কমে গেলে তাৎক্ষণিক কী করা উচিত?
উত্তর: লো প্রেসার হলে সাথে সাথে রোগীকে শুইয়ে দিন এবং পা দুটি বালিশের ওপর সামান্য উঁচু করে রাখুন, যাতে ব্রেনে রক্ত চলাচল বাড়ে। এরপর এক গ্লাস পানিতে আধা চামচ লবণ ও সামান্য চিনি মিশিয়ে (বা খাবার স্যালাইন) খাইয়ে দিন।
২. হাই প্রেসার কি পুরোপুরি ভালো হয়?
উত্তর: হাই প্রেসার কোনো সংক্রামক রোগ নয় যে ওষুধ খেলে একেবারে সেরে যাবে। এটি একটি লাইফস্টাইল ডিজিজ। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস (লবণ কম খাওয়া, হাঁটাচলা করা) মেনে চললে প্রেসার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। (ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা হাই প্রেসার কমানোর অন্যতম শর্ত, তাই প্রতিদিন মেদ মনিটর করার জন্য ঘরে একটি ডিজিটাল ওয়েট স্কেল (Weight Scale) ব্যবহার করুন)।
৩. তেঁতুল খেলে কি প্রেসার কমে?
উত্তর: এটি আমাদের দেশে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা। তেঁতুলে প্রচুর পটাশিয়াম ও ভিটামিন সি থাকে, যা রক্তনালীর জন্য ভালো, কিন্তু তেঁতুল গোলা পানি খেলে হাই প্রেসার সাথে সাথে কমে যায়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। প্রেসার ওঠানামা করলে কখনোই নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে হাই প্রেসারের বা লো প্রেসারের ওষুধ কিনে খাবেন না। এতে ব্রেন স্ট্রোক বা কিডনি নষ্ট হওয়ার মতো মারাত্মক বিপদ হতে পারে। বুকে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *