ক্যান্সার রোগীর শেষ সময়ের লক্ষণ ও স্বজনদের করণীয়

ক্যান্সার একটি জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগ। এই রোগের শেষ পর্যায় বা টার্মিনাল স্টেজটি রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সবার জন্যই অত্যন্ত কষ্টের এবং আবেগের। প্রিয়জনকে হারানোর ভয় মেনে নেওয়া খুবই কঠিন হলেও, মৃত্যুর আগের স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকলে রোগীর কষ্ট কমানো এবং তাকে শেষ দিনগুলোতে একটু শান্তিতে রাখা সম্ভব হয়।
ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে রোগীর শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে, কারণ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে। এই আর্টিকেলে আমরা জানবো ক্যান্সার রোগীর শেষ মুহূর্তের লক্ষণগুলো কী এবং এ সময় স্বজন হিসেবে আপনাদের করণীয় কী।


ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুর আগের প্রধান লক্ষণসমূহ


মৃত্যুর আগের সপ্তাহ বা দিনগুলোতে রোগীর শরীরে বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা দেয়। তবে সবার ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো একরকম নাও হতে পারে। প্রধান লক্ষণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. অতিরিক্ত ঘুম ও চরম ক্লান্তি
রোগীর শরীর এ সময় খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া কমে যাওয়ার কারণে রোগী দিনের বেশিরভাগ সময়ই ঘুমিয়ে কাটান। এমনকি ডাকলেও সহজে সাড়া দিতে পারেন না বা চোখ খুলতে কষ্ট হয়।
২. খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অরুচি
শরীরের অঙ্গগুলো কাজ করা কমিয়ে দেওয়ায় রোগীর খাবার হজম করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এ সময় ক্ষুধা বা তৃষ্ণা একেবারেই থাকে না। শেষের দিকে পানি গিলতেও রোগীর কষ্ট হতে পারে।
৩. শ্বাস-প্রশ্বাসে অস্বাভাবিকতা
মৃত্যুর কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টা আগে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরনে বড় পরিবর্তন আসে। শ্বাস অনেক দ্রুত বা খুব ধীর হতে পারে। অনেক সময় গলার ভেতরে কফ বা তরল জমে যাওয়ার কারণে শ্বাস নেওয়ার সময় ঘড়ঘড় শব্দ হয় (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় Death Rattle বলা হয়)। এটি পরিবারের জন্য ভীতিকর হলেও, রোগী সাধারণত এই শব্দটির কারণে কোনো ব্যথা অনুভব করেন না।
৪. হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এবং ত্বকের রঙ পরিবর্তন
হৃৎপিণ্ড যখন ধীরে ধীরে কাজ করা কমিয়ে দেয়, তখন শরীরের প্রান্তিক অঙ্গগুলোতে (যেমন: হাত, পা, আঙুল) রক্ত চলাচল কমে যায়। ফলে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে এবং অনেক সময় ত্বকের রঙ ফ্যাকাশে বা নীলাভ হয়ে যেতে পারে।
৫. মানসিক বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা
মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছানোর কারণে রোগী অনেক সময় বিভ্রান্ত আচরণ করতে পারেন। তিনি কোথায় আছেন বা আশেপাশে কে আছেন, তা চিনতে ভুল করতে পারেন। অনেক সময় অকারণে হাত-পা ছোঁড়া বা প্রলাপ বকার মতো লক্ষণও দেখা যায়।
৬. প্রস্রাব ও মলত্যাগে নিয়ন্ত্রণ হারানো
কিডনি এবং অন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রস্রাবের পরিমাণ একেবারেই কমে যায় এবং রঙ গাঢ় হয়ে যায়। অনেক সময় রোগীর প্রস্রাব বা মলত্যাগের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।


লক্ষণ এবং এর পেছনের কারণ (এক নজরে)


লক্ষণগুলো কেন দেখা দেয়, তা সহজে বোঝার জন্য নিচের টেবিলটি লক্ষ্য করুন:

লক্ষণের ধরনশরীরের ভেতরে যা ঘটে
অতিরিক্ত ঘুমশরীরের শক্তি কমে যায় এবং মেটাবলিজম ধীর হয়ে আসে।
খাওয়ার অরুচিহজম প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে শরীর আর খাবার গ্রহণ করতে পারে না।
শ্বাস নিতে শব্দ হওয়াগলার পেশি দুর্বল হয়ে পড়ায় লালা বা তরল গিলতে না পারা।
হাত-পা ঠান্ডা হওয়ারক্ত সঞ্চালন কমে গিয়ে শুধু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে (হার্ট ও ব্রেন) রক্ত জমা হওয়া।
মানসিক বিভ্রান্তিমস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যাওয়া।


এই সময়ে স্বজনদের করণীয় কী?


এই কঠিন সময়ে রোগীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আরাম এবং মানসিক প্রশান্তি। স্বজন হিসেবে আপনি নিচের কাজগুলো করতে পারেন:
জোর করে খাবার বা পানি খাওয়াবেন না: রোগী খেতে না চাইলে তাকে জোর করবেন না। এতে খাবার শ্বাসনালীতে গিয়ে রোগীর কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ঠোঁট শুকিয়ে গেলে ভেজা তুলো বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে দিতে পারেন।
বিছানায় আরাম নিশ্চিত করুন: একটানা শুয়ে থাকার কারণে রোগীর শরীরে বেডসোর (Bed Sore) বা ঘা হতে পারে। তাই আরামদায়ক বিছানা বা এয়ার ম্যাট্রেস ব্যবহার করুন এবং তাকে নরম বালিশের সাপোর্ট দিন।
কথা বলুন এবং স্পর্শ করুন: চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, মানুষের সব ইন্দ্রিয়ের মধ্যে ‘শ্রবণশক্তি’ সবার শেষে কাজ করা বন্ধ করে। রোগী হয়তো আপনার কথার উত্তর দিতে পারবেন না, কিন্তু তিনি শুনতে পান। তাই তার হাত ধরে রাখুন, তাকে সাহস দিন এবং নরম সুরে কথা বলুন।
প্যালিয়েটিভ কেয়ার (Palliative Care): রোগীর যদি খুব ব্যথা থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক ওষুধ দিন। এই সময়ে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য রোগ সারানো নয়, বরং রোগীর শারীরিক কষ্ট কমানো।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. মৃত্যুর আগে কি ক্যান্সার রোগীরা খুব ব্যথা পান?
উত্তর: এটি ক্যান্সারের ধরন এবং স্টেজের ওপর নির্ভর করে। অনেক রোগীর তীব্র ব্যথা থাকতে পারে, আবার অনেকে একদম শান্তভাবে মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক ব্যথানাশক (যেমন: মরফিন) ব্যবহার করে রোগীর কষ্ট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
২. শ্বাস নেওয়ার সময় ঘড়ঘড় শব্দ হলে কি সাকশন মেশিন ব্যবহার করা উচিত?
উত্তর: না, সাধারণত সাকশন মেশিন ব্যবহার করলে রোগীর গলার ভেতরে অস্বস্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। এর বদলে রোগীকে একপাশে কাত করে শুইয়ে দিলে লালা বা তরল সহজে বেরিয়ে আসতে পারে এবং শব্দ কমে যায়।
৩. রোগী কোমায় চলে গেলে কি তিনি আমাদের কথা শুনতে পান?
উত্তর: হ্যাঁ, অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, রোগী অচেতন থাকলেও তার শ্রবণশক্তি সচল থাকতে পারে। তাই তার পাশে বসে ইতিবাচক ও ভালোবাসার কথা বলা উচিত।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ ধারণা ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য তৈরি করা হয়েছে। ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে রোগীর যেকোনো কষ্ট বা ব্যথার উপশমের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *