সিজারের পর ইনফেকশনের লক্ষণ: দ্রুত শনাক্ত ও বিপদমুক্তির উপায়

সিজারিয়ান ডেলিভারি বা সি-সেকশন (C-Section) একজন মায়ের জীবনের অন্যতম বড় একটি অস্ত্রোপচার। সন্তান জন্মদানের এই আনন্দময় মুহূর্তে মায়ের শরীরের ওপর দিয়ে বিশাল এক ধকল যায়। সিজারের পর ঘা শুকাতে এবং শরীর আগের অবস্থায় ফিরে আসতে বেশ কিছুটা সময় প্রয়োজন। এই পুরো রিকভারি বা সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় যে ভয়ের কারণটি থাকে, তা হলো ‘ইনফেকশন’ বা সংক্রমণ।
অপরিষ্কার পরিবেশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া বা সেলাইয়ের স্থানে সঠিক যত্ন না নেওয়ার কারণে সিজারের পর ইনফেকশন হতে পারে। এটি মারাত্মক আকার ধারণ করার আগেই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। চলুন জেনে নিই, একজন প্রসূতি মায়ের দ্রুত বিপদমুক্তির জন্য সিজারের পর ইনফেকশনের লক্ষণ গুলো কী কী এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বাধ্যতামূলক।


সিজারের পর ইনফেকশনের প্রধান ৬টি লক্ষণ


সিজারের সেলাইয়ের স্থানে (Incision site), জরায়ুতে অথবা প্রস্রাবের রাস্তায় ইনফেকশন হতে পারে। সাধারণত অস্ত্রোপচারের প্রথম কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে:
তীব্র জ্বর ও কাঁপুনি: সিজারের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হালকা জ্বর আসা স্বাভাবিক, তবে জ্বর যদি ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (38°C) বা তার বেশি হয় এবং সাথে প্রচণ্ড কাঁপুনি থাকে, তবে তা ইনফেকশনের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম সংকেত। (টিপস: সিজারের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ শরীরের তাপমাত্রার দিকে কড়া নজর রাখা জরুরি। জ্বরের সামান্য সন্দেহ হলে দ্রুত মেপে দেখার জন্য হাতের কাছে একটি নির্ভুল ডিজিটাল থার্মোমিটার (Digital Thermometer) রাখা উচিত)।
সেলাইয়ের স্থানে লালচে ভাব ও অস্বাভাবিক ব্যথা: সেলাইয়ের জায়গার চারপাশ যদি অতিরিক্ত লাল হয়ে যায়, ফুলে ওঠে এবং ব্যথার মাত্রা কমার বদলে দিন দিন বাড়তে থাকে।
সেলাই থেকে পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের হওয়া: কাটা স্থান থেকে যদি সাদা, হলুদ বা সবুজ রঙের পুঁজ বের হয় কিংবা রক্তমিশ্রিত দুর্গন্ধযুক্ত কোনো কষ বা তরল নিঃসৃত হয়।
যোনিপথে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা অস্বাভাবিক রক্তপাত: ডেলিভারির পর যোনিপথে রক্তপাত (লোচিয়া) হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই রক্তপাতের পরিমাণ যদি হঠাৎ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, রক্তে বড় বড় চাকা থাকে অথবা স্রাব থেকে তীব্র দুর্গন্ধ আসে, তবে তা জরায়ুর ইনফেকশনের লক্ষণ।
প্রস্রাবে তীব্র জ্বালাপোড়া বা ব্যথা: প্রস্রাব করার সময় প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া, ব্যথা বা বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের (UTI) লক্ষণ, যা ক্যাথেটার ব্যবহারের কারণে হতে পারে।
তলপেটে একটানা তীব্র ব্যথা: সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার পরও যদি তলপেটে বা সেলাইয়ের আশেপাশে একটানা তীব্র ব্যথা থাকে এবং পেট অতিরিক্ত শক্ত মনে হয়।


স্বাভাবিক ব্যথা নাকি ইনফেকশন? (পার্থক্য বুঝুন)


সিজারের পর কিছুদিন ব্যথা বা অস্বস্তি থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনটি স্বাভাবিক আর কোনটি ইনফেকশন, তা নিচের ছকটি থেকে সহজেই বুঝতে পারবেন:

লক্ষণের ধরনস্বাভাবিক নিরাময় প্রক্রিয়া (Normal Healing)ইনফেকশনের সন্দেহজনক সংকেত (Infection)
ব্যথার ধরনপ্রথম কয়েকদিন ব্যথা থাকে, যা ওষুধে কমে এবং দিন দিন অবস্থার উন্নতি হয়।ব্যথার মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে এবং ওষুধেও কোনো কাজ হয় না।
সেলাইয়ের স্থানসেলাইয়ের জায়গা হালকা গোলাপি থাকে এবং ক্রমশ শুকিয়ে আসে।জায়গাটি টকটকে লাল হয়ে ফুলে ওঠে এবং হাত দিলেই গরম অনুভূত হয়।
রক্তপাত বা স্রাবপ্রথম কিছুদিন ভারী রক্তপাত হয়, যা ধীরে ধীরে কমে হালকা রঙের হয়ে যায়।রক্তপাতের সাথে দুর্গন্ধ থাকে এবং হঠাৎ করে তা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়।
তাপমাত্রাশরীর হালকা গরম লাগতে পারে বা সামান্য জ্বর আসতে পারে।কাঁপুনি দিয়ে তীব্র জ্বর (১০১° বা তার বেশি) আসে।


ইনফেকশন এড়াতে মায়ের করণীয়


সেলাইয়ের স্থান সবসময় পরিষ্কার এবং শুকনো রাখতে হবে। গোসলের পর ওই স্থান আলতো করে মুছে শুকিয়ে নিতে হবে।
চিকিৎসক যে অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথার ওষুধ দেবেন, তার সম্পূর্ণ কোর্স নিয়ম মেনে শেষ করতে হবে। মাঝপথে ওষুধ বাদ দেওয়া যাবে না।
খুব বেশি আঁটসাঁট কাপড় না পরে ঢিলেঢালা সুতির কাপড় পরতে হবে, যেন সেলাইয়ের জায়গায় ঘষা না লাগে। (টিপস: হাঁটাচলা বা ওঠার সময় পেটের পেশিতে যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেজন্য চিকিৎসকের পরামর্শে একটি ভালো মানের অ্যাবডমিনাল বেল্ট (Abdominal Belt) বা ম্যাটারনিটি সাপোর্ট ব্যবহার করলে সেলাইয়ের জায়গা সুরক্ষিত থাকে এবং চলাফেরায় আরাম মেলে)।
প্রচুর পানি পান করতে হবে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে ফাইবারযুক্ত খাবার খেতে হবে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. সিজারের সেলাই শুকাতে সাধারণত কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: বাইরের সেলাই বা কাটা দাগ শুকাতে সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সময় লাগে। তবে জরায়ু এবং ভেতরের টিস্যুগুলো পুরোপুরি শুকাতে ও স্বাভাবিক হতে প্রায় ৬ সপ্তাহ বা দেড় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
২. ইনফেকশন হলে কি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনফেকশন থাকলেও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নিরাপদ। তবে আপনি যে অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছেন তা শিশুর জন্য নিরাপদ কি না, সে বিষয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে কথা বলে নিতে হবে।
৩. হাঁচি বা কাশি দিলে কি সেলাই ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকে?
উত্তর: সরাসরি ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় না থাকলেও, হাঁচি-কাশি বা হাসার সময় পেটে চাপ পড়ে ব্যথা হতে পারে। এ সময় সেলাইয়ের স্থানে একটি নরম বালিশ বা হাত দিয়ে হালকা চেপে ধরলে ব্যথা কম লাগে।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। সিজারের পর শরীরে যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিক ব্যথা, তীব্র জ্বর বা সেলাইয়ের স্থান থেকে পুঁজ বের হতে দেখলে এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত আপনার গাইনোকোলজিস্ট বা সার্জনের সাথে যোগাযোগ করুন। এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *