জরায়ু টিউমারের লক্ষণজরায়ু টিউমারের ৫টি লক্ষণ: সাধারণ ব্যথা নাকি বড় বিপদ?জরায়ু টিউমারের লক্ষণ

মহিলাদের প্রজননতন্ত্রের একটি অতি পরিচিত সমস্যা হলো জরায়ুর টিউমার, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ফাইব্রয়েড’ বা ‘মায়োমা’ (Uterine Fibroids) বলা হয়। ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে আশার কথা হলো, জরায়ুর টিউমার মানেই ক্যানসার নয়। শতকরা ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো বিনাইন (Benign) বা সাধারণ টিউমার হয়, যা ক্যানসারে রূপ নেয় না।
অধিকাংশ নারীর জরায়ুতেই ছোটখাটো টিউমার থাকতে পারে, যা কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। কিন্তু টিউমারের আকার বড় হতে থাকলে বা সংখ্যায় বেড়ে গেলে এটি দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় জরায়ু টিউমারের লক্ষণ গুলোকে সাধারণ মাসিকের সমস্যা ভেবে অনেকেই এড়িয়ে যান। চলুন জেনে নিই, শরীরের কোন সংকেতগুলো দেখলে আপনার দ্রুত একজন গাইনোকোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।


জরায়ু টিউমারের প্রধান ৫টি লক্ষণ


টিউমারের আকার, সংখ্যা এবং জরায়ুর ঠিক কোন অবস্থানে এটি রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। তবে সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গগুলো নিচে দেওয়া হলো:
অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী মাসিক (Heavy Bleeding): এটি জরায়ু টিউমারের সবচেয়ে প্রধান লক্ষণ। মাসিকের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি রক্তপাত হওয়া, রক্তে বড় বড় চাকা বা ক্লট (Clots) যাওয়া এবং মাসিক ৭ দিনের বেশি স্থায়ী হওয়া। অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে রোগীর মারাত্মক রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া) ও দুর্বলতা দেখা দেয়।
তলপেটে তীব্র ব্যথা ও ভারী ভাব (Pelvic Pain): টিউমার বড় হতে থাকলে তলপেটে সবসময় এক ধরনের ভোঁতা ব্যথা, চাপ বা ভারী অনুভূতি থাকে। মাসিকের সময় এই ব্যথা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। (টিপস: মাসিকের সময় বা টিউমারের কারণে তলপেটে তীব্র ব্যথা হলে চিকিৎসকের ওষুধের পাশাপাশি একটি ভালো মানের হিটিং প্যাড (Heating Pad) বা হিট থেরাপি ব্যবহার করলে জরায়ুর পেশির সংকোচন কমে এবং চমৎকার আরাম পাওয়া যায়)।
ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ বা কোষ্ঠকাঠিন্য: টিউমারটি যদি জরায়ুর সামনের দিকে থাকে, তবে তা মূত্রথলির (Bladder) ওপর চাপ দেয়। এর ফলে বারবার প্রস্রাবের বেগ হয় বা প্রস্রাব আটকে যাওয়ার সমস্যা হয়। অন্যদিকে টিউমারটি পেছনের দিকে থাকলে তা মলাশয়ের ওপর চাপ দেয়, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়।
কোমর ও পিঠের নিচের দিকে ব্যথা: বড় আকারের টিউমার অনেক সময় মেরুদণ্ড বা পিঠের নিচের স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে কোমরে একটানা তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। (দীর্ঘস্থায়ী এই কোমর ব্যথায় চলাফেরার সময় মেরুদণ্ডকে সুরক্ষিত রাখতে একটি লাম্বার সাপোর্ট বেল্ট (Lumbar Support Belt) বা পেশি রিল্যাক্স করতে বডি ম্যাসাজার ব্যবহার করা বেশ কার্যকরী)।
পেট অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া: টিউমারের আকার খুব বড় হয়ে গেলে অনেক সময় বাইরে থেকে পেট ফোলা বা উঁচু মনে হতে পারে, যাকে অনেকেই ভুল করে গর্ভাবস্থা বা মেদ বেড়ে যাওয়া ভেবে বিভ্রান্ত হন।


স্বাভাবিক সমস্যা নাকি টিউমারের সংকেত? (পার্থক্য বুঝুন)


আপনার তলপেটের ব্যথা বা মাসিকের সমস্যাটি কি স্বাভাবিক নাকি টিউমারের লক্ষণ, তা নিচের ছকটি থেকে সহজেই বুঝতে পারবেন:

লক্ষণের ধরনস্বাভাবিক মাসিকের সমস্যাজরায়ু টিউমারের সন্দেহজনক সংকেত
রক্তপাতের পরিমাণসাধারণত প্রথম ২-৩ দিন বেশি থাকে এবং তারপর কমে যায়।প্যাড খুব দ্রুত ভিজে যায়, বড় চাকা যায় এবং ৭ দিনের বেশি ব্লিডিং থাকে।
পেট ব্যথামাসিকের প্রথম ১-২ দিন তলপেটে বা কোমরে ব্যথা থাকে।মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা তো থাকেই, অন্যান্য সময়েও পেটে ভারী চাপ থাকে।
প্রস্রাবের সমস্যাপ্রস্রাব একদম স্বাভাবিক থাকে।পর্যাপ্ত পানি না খেলেও বারবার প্রস্রাবের বেগ হয়।
দুর্বলতাস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকে, যা বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যায়।অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং চরম রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. জরায়ুতে টিউমার থাকলে কি মা হওয়া যায় না?
উত্তর: জরায়ুর টিউমার থাকলেই যে কেউ মা হতে পারবেন না, এমনটি নয়। অনেক নারীই ছোট টিউমার নিয়ে সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দেন। তবে টিউমারটি যদি ফ্যালোপিয়ান টিউবের মুখ বন্ধ করে দেয় বা ভ্রূণ বড় হওয়ার জায়গায় বাধা সৃষ্টি করে, তবে তা গর্ভধারণে সমস্যা (Infertility) তৈরি করতে পারে এবং বারবার গর্ভপাত বা মিসক্যারেজ হতে পারে।
২. সব জরায়ু টিউমারেই কি অপারেশন বা সার্জারি লাগে?
উত্তর: না। টিউমার ছোট হলে এবং কোনো কষ্ট বা লক্ষণ না থাকলে চিকিৎসকরা সাধারণত অপারেশনের পরামর্শ দেন না; ওষুধের মাধ্যমেই এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে টিউমারের আকার বড় হলে, অতিরিক্ত রক্তপাত হলে বা ক্যানসারের সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকরা ল্যাপারোস্কোপি বা হিস্টেরেক্টমি (জরায়ু ফেলে দেওয়া) করার পরামর্শ দেন।
৩. মেনোপজের পর কি জরায়ু টিউমার হতে পারে?
উত্তর: জরায়ুর টিউমার মূলত ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের প্রভাবে বাড়ে। তাই মেনোপজ বা মাসিক চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মহিলাদের শরীরে এই হরমোনগুলোর মাত্রা কমে যায়, যার ফলে নতুন করে টিউমার হওয়ার ঝুঁকি থাকে না এবং আগে থেকে থাকা টিউমারগুলোও প্রাকৃতিকভাবে ছোট হতে শুরু করে।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী মাসিক, তলপেটে অস্বাভাবিক ব্যথা বা জরায়ু টিউমারের সন্দেহজনক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিজে নিজে ব্যথার ওষুধ না খেয়ে, সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *