দীর্ঘ ৯ মাসের প্রতীক্ষা শেষে যখন সন্তান পৃথিবীতে আসার সময় ঘনিয়ে আসে, তখন হবু মায়ের মনে যেমন আনন্দ থাকে, তেমনি ভয়ও কাজ করে। ডেলিভারির সময় বা লেবার পেইন (Labor Pain) কখন উঠবে, তা নিয়ে চিন্তায় থাকেন সবাই। চিকিৎসকদের মতে, প্রসবের দিনক্ষণ হুট করে আসে না; শরীর বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই কিছু নীরব সংকেত দিতে শুরু করে।
সঠিক সময়ে নরমাল ডেলিভারি হওয়ার লক্ষণ গুলো বুঝতে পারলে হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া অনেক সহজ হয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়ানো যায়। চলুন জেনে নিই, একজন গর্ভবতী মায়ের শরীর প্রসবের আগে ঠিক কী কী সংকেত দেয় এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বাধ্যতামূলক।
নরমাল ডেলিভারি হওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ
গর্ভধারণের ৩৭ থেকে ৪০ সপ্তাহের মধ্যে যেকোনো সময় প্রসবের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রধান সংকেতগুলো নিচে দেওয়া হলো:
শিশু নিচে নেমে আসা (Lightening): প্রসবের কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক দিন আগে শিশু তার মাথা মায়ের পেলভিস বা শ্রোণী গহ্বরের দিকে নামিয়ে আনে। এসময় মায়ের বুকের ওপর চাপ কমে যায় এবং শ্বাস নিতে সুবিধা হয়, তবে তলপেটে বা জরায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ অনুভূত হয়। (টিপস: শেষ মাসগুলোতে পেট অতিরিক্ত ভারী হয়ে নিচের দিকে ঝুলে যাওয়ার কারণে তলপেটে বা কোমরে যে চাপ পড়ে, তা থেকে স্বস্তি পেতে চিকিৎসকের পরামর্শে একটি ভালো মানের ম্যাটারনিটি সাপোর্ট বেল্ট (Maternity Support Belt) ব্যবহার করা অত্যন্ত আরামদায়ক)।
মিউকাস প্লাগ বের হওয়া (Bloody Show): গর্ভাবস্থায় জরায়ুমুখকে ব্যাকটেরিয়া থেকে সুরক্ষিত রাখতে একটি আঠালো আবরণ বা ‘মিউকাস প্লাগ’ থাকে। জরায়ুমুখ খুলতে শুরু করলে এটি খসে পড়ে যায়। ফলে যোনিপথে গোলাপি বা হালকা লালচে রক্তমিশ্রিত আঠালো স্রাব দেখা যায়, যা ডেলিভারি খুব কাছাকাছি আসার একটি বড় লক্ষণ।
কোমর ও তলপেটে একটানা ব্যথা: মাসিকের ব্যথার মতো তলপেটে একটানা মোচড়ানো ব্যথা এবং কোমরের নিচের দিকে তীব্র ব্যথা অনুভব হওয়া প্রসবের অন্যতম পূর্বলক্ষণ। জরায়ুর পেশিগুলো সংকুচিত হতে শুরু করলে এই ব্যথা হয়। (জরায়ু এবং কোমরের এই তীব্র ব্যথা সাময়িকভাবে উপশম করতে চিকিৎসকের ওষুধের পাশাপাশি পিঠের নিচের অংশে একটি হিটিং প্যাড (Heating Pad) ব্যবহার করলে পেশি দ্রুত রিল্যাক্স হয় এবং ম্যাজিকের মতো আরাম মেলে)।
নিয়মিত ও তীব্র প্রসব বেদনা (Contractions): এটি নরমাল ডেলিভারির সবচেয়ে নিশ্চিত সংকেত। জরায়ুর সংকোচন ও প্রসারণের কারণে এই ব্যথা হয়। শুরুতে ব্যথা হালকা থাকলেও ধীরে ধীরে ব্যথার তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব বাড়তে থাকে। যখন প্রতি ৫ মিনিট পরপর ব্যথা আসে এবং প্রায় ১ মিনিট স্থায়ী হয়, তখন বুঝতে হবে সময় একদম ঘনিয়ে এসেছে।
পানি ভেঙে যাওয়া (Water Breaking): জরায়ুর ভেতরে শিশু যে অ্যামনিওটিক তরলের থলিতে ভাসতে থাকে, সেটি ছিঁড়ে যোনিপথ দিয়ে হঠাৎ করে প্রচুর পরিষ্কার পানি বা তরল বের হতে শুরু করলে তাকে পানি ভাঙা বলে। এটি হলে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
ফলস পেইন (Braxton Hicks) নাকি আসল প্রসব বেদনা? (পার্থক্য বুঝুন)
গর্ভাবস্থার শেষের দিকে প্রায়ই পেটে হালকা ব্যথা হতে পারে, যাকে ‘ফলস পেইন’ বলা হয়। আপনার ব্যথাটি আসল নাকি নকল, তা নিচের ছকটি থেকে সহজেই বুঝতে পারবেন:
| লক্ষণের ধরন | ফলস পেইন (প্রস্তুতিমূলক ব্যথা) | আসল প্রসব বেদনা (True Labor) |
| ব্যথার ধরন | ব্যথা অনিয়মিত হয় এবং ব্যথার তীব্রতা বাড়ে না। | ব্যথা নিয়মিত বিরতিতে আসে এবং তীব্রতা দিন দিন বাড়তে থাকে। |
| ব্যথার স্থান | সাধারণত শুধুমাত্র তলপেটে বা পেটের সামনের অংশে অনুভূত হয়। | ব্যথা কোমর থেকে শুরু হয়ে তলপেটের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। |
| হাঁটাহাঁটি বা বিশ্রাম | পজিশন পরিবর্তন করলে, হাঁটলে বা বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে যায়। | হাঁটাহাঁটি বা বিশ্রাম নিলেও ব্যথা কমে না, বরং বাড়তে থাকে। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. পানি ভাঙার কতক্ষণের মধ্যে ডেলিভারি হওয়া উচিত?
উত্তর: পানি ভাঙার পর সাধারণত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডেলিভারি হওয়া নিরাপদ। কারণ পানি ভেঙে গেলে শিশুকে সুরক্ষিত রাখার আবরণটি আর থাকে না, ফলে ইনফেকশনের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
২. প্রসবের আগে কি শিশুর নড়াচড়া কমে যায়?
উত্তর: প্রসবের সময় যত ঘনিয়ে আসে, জরায়ুর ভেতরে জায়গা কমে যাওয়ায় শিশুর বড় বড় মুভমেন্ট বা লাথি মারা কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে নড়াচড়া একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় না। যদি শিশুর নড়াচড়া অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় বা ১০ ঘণ্টায় ১০ বারের কম নড়ে, তবে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
৩. প্রথম প্রেগন্যান্সিতে লেবার পেইন কতক্ষণ স্থায়ী হতে পারে?
উত্তর: প্রথমবার মা হওয়ার ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ পুরোপুরি খুলতে সাধারণত ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে এটি একেকজনের শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে কমবেশি হতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদি পানি ভেঙে যাওয়ার পর তরলের রঙ সবুজ বা দুর্গন্ধযুক্ত হয়, যোনিপথে তাজা রক্তপাত শুরু হয় অথবা জ্বরের সাথে কাঁপুনি থাকে, তবে এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে দ্রুত রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যান। (টিপস: পানি ভাঙার পর শরীরে কোনো ইনফেকশন হলো কি না, তা বুঝতে জ্বরের তাপমাত্রা নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে হাতের কাছে একটি ডিজিটাল থার্মোমিটার রাখা অত্যন্ত জরুরি)।