পরিপাকতন্ত্রের অন্যতম দীর্ঘ অংশ হলো বৃহদন্ত্র বা কোলন। আর এই কোলন বা মলদ্বারে যখন অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি ঘটে, তখন তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কোলন ক্যান্সার’ (Colon Cancer) বা কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বলা হয়। বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই রোগটি।
প্রথম দিকে এই ক্যান্সারের লক্ষণগুলো এতই সাধারণ হয় যে, বেশিরভাগ মানুষ একে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক, আমাশয়, কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাইলস ভেবে দীর্ঘদিন অবহেলা করেন। কিন্তু সঠিক সময়ে কোলন ক্যান্সারের লক্ষণ শনাক্ত করতে না পারলে এই নীরব ঘাতক লিভার বা ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। চলুন জেনে নিই, প্রাথমিক অবস্থায় শরীর কী কী নীরব সংকেত দেয় এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বাধ্যতামূলক।
কোলন ক্যান্সারের প্রধান ৫টি লক্ষণ ও সংকেত
কোলনের ভেতরে টিউমার বা পলিপ বড় হতে থাকলে মলত্যাগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
মলত্যাগের অভ্যাসে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন: হঠাৎ করেই যদি দেখেন আপনার দীর্ঘদিনের মলত্যাগের রুটিন বদলে গেছে—যেমন, টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া হচ্ছে, অথবা মল একদম চিকন ফিতার মতো বের হচ্ছে, তবে এটি কোলনে ব্লকেজ বা টিউমারের বড় একটি সংকেত।
পায়খানার সাথে রক্ত পড়া (সবচেয়ে বড় লক্ষণ): মলের সাথে কালচে মেরুন রঙের রক্ত মিশে থাকা বা আলকাতরার মতো কালো মল হওয়া কোলন ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। টিউমার থেকে রক্তক্ষরণের কারণেই এমনটা হয়।
তলপেটে একটানা মোচড়ানো ব্যথা ও গ্যাস: পেটের ভেতরে টিউমার বড় হতে থাকলে তা অন্ত্রের পথ সরু করে দেয়। এর ফলে খাবার ঠিকমতো হজম হয় না, সারাক্ষণ পেট ফেঁপে থাকে এবং তলপেটে একটানা কামড়ানো বা মোচড়ানো ব্যথা হয়। (টিপস: অন্ত্রের বা তলপেটের এই একটানা তীব্র অস্বস্তি ও পেশির ব্যথা সাময়িকভাবে উপশম করতে চিকিৎসকের ওষুধের পাশাপাশি পেটে একটি ভালো মানের হিটিং প্যাড (Heating Pad) ব্যবহার করলে দারুণ আরাম মেলে)।
অকারণে ওজন হ্রাস ও চরম ক্লান্তি: কোনো ধরনের ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই হঠাৎ করে শরীরের ওজন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া কোলন ক্যান্সারের একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ। ক্যান্সারের কোষগুলো শরীরের সমস্ত পুষ্টি শুষে নেয় বলে রোগী সারাক্ষণ চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করেন। (বিনা পরিশ্রমে শরীরের এই তীব্র ক্লান্তি ও পেশির আড়ষ্টতায় একটি বডি ম্যাসাজার (Body Massager) সাময়িক স্বস্তি দিলেও, এর আসল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। এছাড়া ওজনের এই অস্বাভাবিক পতন নিখুঁতভাবে মনিটর করার জন্য ঘরে একটি নির্ভুল ডিজিটাল ওয়েট স্কেল (Weight Scale) ব্যবহার করা উচিত)।
রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া: অন্ত্রের ভেতরের টিউমার থেকে দিনের পর দিন অল্প অল্প করে রক্তক্ষরণ হওয়ার কারণে রোগীর মারাত্মক রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। এর ফলে রোগীর শ্বাসকষ্ট হয়, শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং প্রেশার লো হয়ে মাথা ঘোরে। (রক্তশূন্যতার কারণে রোগীর রক্তচাপ বা প্রেশার হঠাৎ ফল করছে কি না, তা সাথে সাথে চেক করার জন্য হাতের কাছে একটি নির্ভুল ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন রাখা অত্যন্ত জরুরি)।
সাধারণ পাইলস নাকি কোলন ক্যান্সার? (পার্থক্য বুঝুন)
মলের সাথে রক্ত গেলেই অনেকে পাইলস ভেবে ভুল করেন। আপনার সমস্যাটি পাইলস নাকি ক্যান্সারের সংকেত, তা নিচের ছকটি থেকে সহজেই বুঝতে পারবেন:
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ পাইলস বা ফিশার | কোলন ক্যান্সারের সন্দেহজনক সংকেত |
| রক্তের রঙ ও ধরন | টকটকে লাল তাজা রক্ত, যা মলের গায়ে লেগে থাকে বা ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে। | গাঢ় লাল বা কালচে মেরুন রঙের রক্ত, যা মলের সাথে পুরোপুরি মিশে থাকে। |
| ব্যথা ও অস্বস্তি | মলত্যাগের সময় মলদ্বারে তীব্র জ্বালাপোড়া বা ব্যথা থাকে। | মলদ্বারে ব্যথা থাকে না, তবে তলপেটে একটানা ভারী ব্যথা বা মোচড়ানো ভাব থাকে। |
| ওজন ও ক্লান্তি | পাইলসে সাধারণত রোগীর ওজন কমে না বা সারাক্ষণ দুর্বল লাগে না। | অকারণে খুব দ্রুত ওজন কমে যায় এবং রোগী চরম দুর্বলতায় ভোগেন। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. কোলন ক্যান্সার নির্ণয়ের প্রধান পরীক্ষা কী?
উত্তর: কোলন ক্যান্সার শনাক্ত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হলো ‘কলোনোস্কোপি’ (Colonoscopy)। একটি ছোট ক্যামেরাযুক্ত নল মলদ্বার দিয়ে প্রবেশ করিয়ে পুরো বৃহদন্ত্র পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য মলে রক্তের উপস্থিতি (FOBT) পরীক্ষাও করা হয়।
২. কোলন ক্যান্সার কি পুরোপুরি ভালো হয়?
উত্তর: হ্যাঁ, একদম প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ ১ বা ২) ধরা পড়লে সার্জারির মাধ্যমে টিউমারটি কেটে ফেললে এবং প্রয়োজনে কেমোথেরাপি দিলে কোলন ক্যান্সার ১০০% সারিয়ে তোলা সম্ভব।
৩. কাদের কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
উত্তর: সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া যাদের পরিবারে কোলন ক্যান্সারের ইতিহাস আছে, যারা অতিরিক্ত লাল মাংস (গরু বা খাসির মাংস) ও প্রসেসড ফুড খান এবং যাদের অতিরিক্ত শারীরিক ওজন রয়েছে, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। মলের সাথে রক্ত যাওয়া বা দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্যকে কখনোই সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করবেন না। নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে পাইলসের বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ না খেয়ে, সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত একজন কোলোরেক্টাল সার্জন (Colorectal Surgeon) বা গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টের পরামর্শ নিন।