দাঁত ব্রাশ করার সময় মাড়ি থেকে সামান্য রক্ত পড়া বা মুখে ছোটখাটো ঘা হওয়া খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। ভিটামিনের অভাব, অপরিষ্কার দাঁত বা সাধারণ ইনফেকশনের কারণে এমনটা হতে পারে। কিন্তু এই ঘা বা রক্তপাত যদি দীর্ঘদিনের সঙ্গী হয়ে যায়, তবে তা মোটেও হেলাফেলা করার বিষয় নয়।
মুখের বা ওরাল ক্যান্সারের একটি অন্যতম ধরন হলো মাড়ির ক্যান্সার (Gum Cancer)। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি কোনো ব্যথা বা বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে না বলে অনেকেই এটি বুঝতে পারেন না। যখন ব্যথা শুরু হয়, তখন হয়তো রোগটি অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সারের লক্ষণ চিনতে পারলে এবং দ্রুত চিকিৎসা নিলে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব। চলুন জেনে নিই, মাড়ির কোন পরিবর্তনগুলো দেখলে আপনার সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সারের প্রধান লক্ষণসমূহ
আপনার মাড়িতে নিচের লক্ষণগুলোর এক বা একাধিক যদি দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে, তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত:
দীর্ঘস্থায়ী ঘা বা ক্ষত: মাড়িতে এমন কোনো ঘা বা আলসার তৈরি হওয়া, যা সাধারণ ওষুধ বা মাউথওয়াশ ব্যবহারের পরও ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে শুকাচ্ছে না। এটি ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় লক্ষণ।
সাদা বা লাল রঙের ছোপ: মাড়ির ভেতরের দিকে বা দাঁতের গোড়ায় অস্বাভাবিক সাদাটে (Leukoplakia) বা গাঢ় লাল রঙের (Erythroplakia) ছোপ বা দাগ দেখা দেওয়া। এই দাগগুলো ঘষলে সাধারণত ওঠে না।
মাড়িতে মাংসপিণ্ড বা চাকা: মাড়ির কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠা, শক্ত হয়ে যাওয়া বা মটরদানার মতো ছোট চাকা বা টিউমার অনুভব করা।
অকারণে দাঁত নড়ে যাওয়া: কোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা বয়সের কারণ ছাড়াই যদি হঠাৎ করে এক বা একাধিক দাঁত অকারণে নড়ে যায় বা পড়ে যায়, তবে বুঝতে হবে মাড়ির ভেতরের হাড় বা টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তীব্র ব্যথা ও রক্তপাত: ব্রাশ করা ছাড়াই অকারণে মাড়ি থেকে রক্তপাত হওয়া এবং মাড়ি ও চোয়ালে একটানা ভোঁতা ব্যথা থাকা।
ঘাড় ও চোয়ালে ব্যথা বা গ্রন্থি ফোলা: ক্যান্সার ছড়াতে শুরু করলে চোয়াল নাড়াতে বা খাবার চিবাতে কষ্ট হয়। গলার বা ঘাড়ের লিম্ফ নোড (লজ্জাস্থান) ফুলে যেতে পারে। (টিপস: দাঁত বা মাড়ির দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কারণে অনেক সময় চোয়াল, ঘাড় এবং মাথা পর্যন্ত তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। পেশির এই আড়ষ্টতা বা টেনশন সাময়িকভাবে কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে ভালো মানের নেক ম্যাসাজার (Neck Massager) বা হিট থেরাপি ডিভাইস ব্যবহার করলে বেশ আরাম পাওয়া যায়। তবে মূল চিকিৎসার জন্য অবশ্যই ডেন্টিস্টের কাছে যেতে হবে)।
সাধারণ মাড়ির রোগ নাকি ক্যান্সার? (পার্থক্য বুঝুন)
জিনজিভাইটিস বা মাড়ির সাধারণ ইনফেকশনের সাথে ক্যান্সারের লক্ষণের কিছু সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। নিচের ছকটি খেয়াল করুন:
| লক্ষণের ধরন | সাধারণ মাড়ির রোগ (Gingivitis) | মাড়ির ক্যান্সার (Gum Cancer) |
| ঘা বা আলসার | সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এমনিতেই বা ওষুধে সেরে যায়। | ৩ সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও শুকায় না, বরং বড় হতে থাকে। |
| রক্তপাতের কারণ | সাধারণত শক্ত কিছু চিবালে বা ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়ে। | কোনো কারণ ছাড়াই বা সামান্য স্পর্শেই রক্তপাত শুরু হয়। |
| মাড়ির রং | পুরো মাড়ি লালচে বা ফুলে থাকতে পারে। | নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় গাঢ় লাল বা সাদা শক্ত ছোপ থাকে। |
| দাঁত নড়ে যাওয়া | দীর্ঘদিনের অবহেলায় দাঁতের গোড়ায় পাথর জমে দাঁত নড়তে পারে। | হঠাৎ করেই নির্দিষ্ট কোনো জায়গার দাঁত আলগা হয়ে যায়। |
মাড়ির ক্যান্সার কেন হয়? (ঝুঁকির কারণ)
ক্যান্সার হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ না থাকলেও, কিছু অভ্যাস এর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়:
১. তামাক ও জর্দা: পান-সুপারির সাথে জর্দা, সাদাপাতা, খয়ের বা তামাক পাতা চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস মাড়ির ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় কারণ।
২. ধূমপান ও মদ্যপান: বিড়ি, সিগারেট বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন ওরাল ক্যান্সারের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ায়।
৩. ভুল মাপের নকল দাঁত (Dentures): যাদের নকল দাঁত বা ডেনচার ঠিকমতো ফিট হয় না এবং মাড়িতে ক্রমাগত ঘষা লাগে, তাদের মাড়িতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত থেকে ক্যান্সার হতে পারে।
৪. এইচপিভি (HPV): হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের সংক্রমণও মুখের ক্যান্সারের অন্যতম একটি কারণ।
প্রতিরোধের উপায় ও করণীয়
দিনে অন্তত দুবার সঠিক নিয়মে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করুন এবং ফ্লস ব্যবহার করুন।
তামাক, জর্দা, গুল এবং ধূমপানের অভ্যাস আজই ত্যাগ করুন।
ধারালো বা ভাঙা দাঁত থাকলে, যা বারবার গাল বা মাড়িতে ঘা তৈরি করে, দ্রুত ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে তা মসৃণ করে নিন বা তুলে ফেলুন।
বছরে অন্তত একবার ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে পুরো মুখ পরীক্ষা (Oral checkup) করান।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. মুখের সাদা দাগ মানেই কি ক্যান্সার?
উত্তর: না, মুখের ভেতরের সব সাদা দাগ বা ‘লিউকোপ্লাকিয়া’ ক্যান্সার নয়। তবে এগুলোকে ক্যান্সারের পূর্বলক্ষণ বা ‘প্রি-ক্যান্সারাস’ অবস্থা বলা হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
২. মাড়ির ক্যান্সার কি পুরোপুরি ভালো হয়?
উত্তর: হ্যাঁ। প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ ১ বা ২) ক্যান্সার ধরা পড়লে সার্জারি বা রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যেতে পারেন। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয় করাটাই সবচেয়ে জরুরি।
৩. মাড়ির ক্যান্সার কি ছোঁয়াচে?
উত্তর: একদমই না। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে কথা বললে, খাবার খেলে বা একই গ্লাস ব্যবহার করলে এই রোগ ছড়ায় না।
৪. দাঁতের ব্যথার সাধারণ ওষুধ খেলে কি ক্যান্সারের ব্যথা কমে?
উত্তর: প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধে কিছুটা আরাম মিললেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। ব্যথা বারবার ফিরে আসাটা ভেতরের বড় কোনো সমস্যারই ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। আপনার মাড়িতে যদি দীর্ঘস্থায়ী ঘা, চাকা বা অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে অযথা দুশ্চিন্তা না করে দ্রুত একজন ডেন্টাল সার্জন বা ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।