ডিম্বাণু বের না হওয়ার লক্ষণ: ওভিউলেশন সমস্যার ৫টি সংকেত

প্রতি মাসে একজন নারীর জরায়ু থেকে একটি পরিপক্ব ডিম্বাণু বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে ‘ওভিউলেশন’ (Ovulation) বলা হয়। গর্ভধারণের জন্য এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু অনেক নারীর ক্ষেত্রেই প্রতি মাসে ডিম্বাণু সঠিকভাবে রিলিজ হয় না বা একেবারেই বের হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাটিকে ‘অ্যানোভুলেশন’ (Anovulation) বলা হয়।
মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব বা সন্তান না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই ওভিউলেশন না হওয়া। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), থাইরয়েডের সমস্যা বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে এমনটি হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরা বুঝতেই পারেন না যে তাদের শরীরে ডিম্বাণু তৈরি হচ্ছে না। সঠিক সময়ে ডিম্বাণু বের না হওয়ার লক্ষণ শনাক্ত করা গেলে দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব। চলুন জেনে নিই, শরীর এক্ষেত্রে কী কী সংকেত দেয়।


ডিম্বাণু বের না হওয়ার প্রধান ৫টি লক্ষণ


ডিম্বাণু রিলিজ না হলে শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে প্রধানত নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
অনিয়মিত মাসিক বা পিরিয়ড বন্ধ থাকা: এটি অ্যানোভুলেশনের সবচেয়ে বড় লক্ষণ। মাসিক যদি ২১ দিনের আগে বা ৩৫ দিনের পরে হয়, কিংবা টানা কয়েক মাস মাসিক পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তবে ধরে নিতে হবে ডিম্বাণু সঠিকভাবে রিলিজ হচ্ছে না।
শরীরের তাপমাত্রায় কোনো পরিবর্তন না আসা (BBT): স্বাভাবিক নিয়মে ওভিউলেশনের ঠিক পরপরই মহিলাদের শরীরের মূল তাপমাত্রা বা ব্যাসাল বডি টেম্পারেচার (BBT) সামান্য বেড়ে যায়। কিন্তু ডিম্বাণু রিলিজ না হলে তাপমাত্রার এই ওঠা-নামা থাকে না। (টিপস: প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরের এই সূক্ষ্ম তাপমাত্রার পরিবর্তন নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করার জন্য ঘরে একটি ভালো মানের ডিজিটাল থার্মোমিটার (Digital Thermometer) রাখা অত্যন্ত জরুরি)।
সাদাস্রাব বা সার্ভাইক্যাল মিউকাসের পরিবর্তন না হওয়া: ওভিউলেশনের ঠিক আগে এবং ওই সময়ে যোনিপথের সাদাস্রাব অনেকটা কাঁচা ডিমের সাদা অংশের মতো স্বচ্ছ, পিচ্ছিল এবং আঠালো হয়ে যায়। ডিম্বাণু বের না হলে স্রাবের এমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না, বরং যোনিপথ শুষ্ক মনে হয়।
অতিরিক্ত রক্তপাত ও তলপেটে ব্যথা: ডিম্বাণু রিলিজ না হলে শরীরে ‘প্রোজেস্টেরন’ হরমোন তৈরি হয় না, যার ফলে জরায়ুর ভেতরের স্তর অতিরিক্ত পুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে যখন মাসিক হয়, তখন প্রচুর রক্তপাত হয় এবং তলপেটে তীব্র ব্যথা বা ক্র্যাম্প হয়। (মাসিকের এই তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি সাময়িকভাবে কমাতে চিকিৎসকের ওষুধের পাশাপাশি তলপেটে একটি হিটিং প্যাড (Heating Pad) ব্যবহার করলে জরায়ুর পেশি দ্রুত রিল্যাক্স হয় এবং দারুণ আরাম মেলে)।
ওজন বৃদ্ধি এবং গর্ভধারণে ব্যর্থতা: স্বামী-স্ত্রী কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়াই টানা এক বছর চেষ্টা করার পরও যদি গর্ভধারণ না হয়, তবে তা ডিম্বাণু বের না হওয়ার একটি বড় লক্ষণ। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো পিসিওএস (PCOS), যার ফলে শরীরে হঠাৎ করে মেদ জমতে শুরু করে। (পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ওভিউলেশন স্বাভাবিক করতে ওজন কমানোর জার্নিটি ট্র্যাক করার জন্য একটি নির্ভুল ডিজিটাল ওয়েট স্কেল (Weight Scale) ব্যবহার করা বেশ কার্যকরী)।


স্বাভাবিক ওভিউলেশন নাকি অ্যানোভুলেশন? (পার্থক্য বুঝুন)


আপনার মাসিক চক্রে কি আসলেই ডিম্বাণু বের হচ্ছে নাকি এটি অ্যানোভুলেশন, তা নিচের ছকটি থেকে সহজেই বুঝতে পারবেন:

লক্ষণের ধরনস্বাভাবিক ওভিউলেশন (Normal)অ্যানোভুলেশন বা ডিম্বাণু না বের হওয়া
মাসিক চক্রসাধারণত ২৮-৩২ দিন পরপর নিয়মিত হয়।চক্রটি অনুমান করা যায় না, খুব ঘন ঘন বা অনেক দেরিতে হয়।
সাদাস্রাবচক্রের মাঝামাঝি সময়ে ডিমের সাদা অংশের মতো পিচ্ছিল স্রাব যায়।মাসিকের মাঝামাঝি সময়ে স্রাবের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না।
তাপমাত্রা (BBT)মাসিকের মাঝামাঝি সময়ে শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পায়।পুরো মাস জুড়েই শরীরের তাপমাত্রা প্রায় একই রকম থাকে।
মাঝামাঝি ব্যথাডিম্বাণু রিলিজ হওয়ার দিন তলপেটের একপাশে হালকা ব্যথা হতে পারে।এ ধরনের কোনো লক্ষণ থাকে না।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)


১. ডিম্বাণু বের না হলেও কি প্রতি মাসে মাসিক হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, পারে। একে অ্যানোভুলেটরি ব্লিডিং (Anovulatory bleeding) বলা হয়। ডিম্বাণু রিলিজ না হলেও ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে জরায়ুর স্তর পুরু হয় এবং পরে তা ভেঙে রক্তপাত হয়, যা দেখতে সাধারণ মাসিকের মতোই মনে হয়।
২. পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) থাকলে কি কখনোই ডিম্বাণু বের হয় না?
উত্তর: পিসিওএস (PCOS) অ্যানোভুলেশনের সবচেয়ে বড় কারণ হলেও এর মানে এই নয় যে কখনোই ডিম্বাণু বের হবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হরমোনের ওষুধ সেবন, ওজন কমানো এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলে পিসিওএস রোগীদেরও নিয়মিত ওভিউলেশন হয় এবং তারা মা হতে পারেন।
৩. ওভিউলেশন কিট দিয়ে কি ডিম্বাণু বের হওয়া নিশ্চিত করা যায়?
উত্তর: ওভিউলেশন প্রেডিক্টর কিট (OPK) প্রস্রাবে লুটেনাইজিং হরমোনের (LH) মাত্রা মেপে বলে দেয় যে কখন ডিম্বাণু বের হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে এটি ১০০% নিশ্চিত করতে পারে না, নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকরা ফলিকুলার স্টাডি বা আল্ট্রাসাউন্ড করার পরামর্শ দেন।


বিশেষ সতর্কতা: এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। আপনি যদি গর্ভধারণের চেষ্টা করেন এবং আপনার মাসিক অনিয়মিত হয়, তবে নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে ওভিউলেশন বা হরমোনের ওষুধ না খেয়ে, সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ গাইনোকোলজিস্ট বা ফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের পরামর্শ নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *